Blog Details

Image

22 Oct 2025

Lutfun Nahar

ব্যক্তিগত ডায়রি

ব্যক্তিগত ডায়রি 

​বুধবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৫

​আজ মনটা খুব খারাপ। সকালে পত্রিকা খুলতে ভয় পাচ্ছিলাম। সেই মেয়েটির আত্মহত্যার খবরটা... যার একমাত্র কারণ হয়তো শুধু অফিসের চাপ ছিল না, ছিল তারই কলিগ বা কাছের (আলতাফ শাহনেওয়াজ) মানুষের লাগাতার মৌখিক নির্যাতন। "যার ব্রেস্টের শেপ এরকম ভচকানো, তার বাংলাটা তো ভচকানোই হবে" —এই লাইনটা যেন মাথায় গেঁথে গেছে। কী ভয়াবহ! একটা মানুষের আত্মসম্মান, তার শারীরিক অস্তিত্বকে আঘাত করার এমন 'প্যাটার্ন অব ক্রিটিসাইজ' কী করে একটা অফিস বছরের পর বছর ধরে চলতে দিতে পারে?

​এই ধরনের যৌন হয়রানি (Verbal Sexual Abuse) যে কতটা ক্ষতিকর, তা প্রমাণ হলো এক তরতাজা জীবনের বিনিময়ে। অথচ, এটা নিয়ে কারো তেমন কোন মাথা ব্যাথা নেই। এমনকি এত ভয়ংকর স্টেমেন্ট শোনার পরও আমার চারপাশের মানুষদের প্রতিক্রিয়া আমাকে আরও বেশি আঘাত করেছে।

​লাঞ্চের সময়, এক ছেলে কলিগ অন্য একজনকে হেসে হেসে বলল, "এই তুমি এমন ভচকায়ে বসে আছো কেনো? দেইখো এই কথা বলছি বলে আবার সুইসাইড করে ফেলো না।" তারপর সবাই হাহা করে হাসতে লাগলো।

​শুনে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। এরা সবাই শিক্ষিত, এবং উদার মনমানসিকতার কাজের সঙ্গে জড়িত, অথচ এদের সংবেদনশীলতা এত নিম্নমানের? একজন মানুষ বডিশেমিং-এর শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে, আর এমন সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে ওরা কৌতুক করছে? এদের কাছে এই খবর দুঃখজনক তো নয়ই, উল্টে এটা উপহাসের খোরাক!

​আমার মনে হলো যেন ওই ট্রলগুলো আমাকে উদ্দেশ্য করেই করা হচ্ছে। আমার নিজের শরীরের প্রতি, নিজের কাজের প্রতি একধরণের অস্বস্তি তৈরি হলো। সমাজের এই বিষাক্ত মানসিকতা আমাকে গ্রাস করছে।

আমি প্রতিবাদ করতে পারলাম না। বা করলামই না, চুপ করে ছিলাম। কেন? কারণ আমি জানি, প্রতিবাদ করলেই আমাকে 'অতি-সংবেদনশীল' বা 'নারী-বাদী' ট্যাগ দেওয়া হবে। কাজের জায়গায় আমি ঝামেলা সৃষ্টিকারী হতে চাই না। এই নিঃশব্দতা আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। আমি নিজেকে গুটিয়ে রাখলাম, যেন আমার কোনো মতামত নেই। ঠিক করলাম এখন থেকে কর্মক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো 'কৌতুক' বা নারীর কাজের সমালোচনা এলে আমি দ্রুত সেখান থেকে সরে যাবো। কারণ, আমি জানি আমার মতামত প্রকাশ করলে কেবল অস্বস্তি বাড়বে, সমাধান হবে না। নিজেকে গুটিয়ে রাখার এই সিদ্ধান্তটাই আমার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। আমি নিজের ভেতরে এক ধরণের ভয় অনুভব করছি—কথা বললে যদি আমাকেই পরের ট্রলের শিকার হতে হয়? এই অসহনীয় পরিবেশই কি তাহলে আমাদের বর্তমান? যেখানে একজন নারী তার আত্মমর্যাদার কথা বললে তাকে ট্রল করা হয়? এই দ্বিধা, এই নীরবতাই আমার ভেতরের 'সুলতানার স্বপ্ন' পূরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। সুলতানার স্বপ্নের মতো নেই নিরাপদ নগরীর দেখা আমরা কবে পাবো?

এই যে না বলা কথাগুলো বলতে চাওয়ার আকাঙ্খা, নিজের প্রতিবাদ, বক্তব্য, দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের এই আকাঙ্খা থেকেই কি আমি চলচ্চিত্র বানাতে এসেছি?

​আজ রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে শুধু ভাবছি আমার বানানো চলচ্চিত্রটি কি এই অসহনীয় নীরবতাকে ভাঙার গল্প বলতে পারবে?

 

লুৎফুন নাহার (মাসুমা)